জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে মানসিক সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। ২০২০ সালে এ হাসপাতালে বহির্বিভাগে ৫ হাজার ৮৫১ শিশু চিকিৎসা নিয়েছিল। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৭৭২-এ। একই সময়ে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া শিশুর সংখ্যা ৭১ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৭৬।
শুধু হাসপাতালের তথ্য নয়, গবেষণাতেও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ বিভাগের ৪০০ কিশোর-কিশোরীর ওপর চালানো এক গবেষণায় ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ এবং ৩২ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে উদ্বেগের উপসর্গ পাওয়া গেছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক অশান্তি, বুলিং, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা এসব লক্ষণকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বা বদমেজাজ ভেবে এড়িয়ে যান। এতে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ১১৬ নম্বর কক্ষে চিকিৎসকের কাছে এসেছিল ১৩ বছরের এক কিশোর। তার মা পাশে বসে ছিলেন। মামা অপেক্ষা করছিলেন বাইরে। মামার অভিযোগ, ছেলেটি ঠিকমতো পড়াশোনা করে না, দিনরাত মোবাইল ব্যবহার করে। কোনো কিছু না পেলে জেদ করে, রাগারাগি করে, এমনকি ভাঙচুরও করে।
পরে কিশোরের মা জানান, স্কুলের শিক্ষকের পরামর্শে ছেলেকে হাসপাতালে এনেছেন তিনি। গাজীপুরে থাকেন তারা। তার স্বামী প্রবাসী। কয়েক বছর ধরে ছেলে নানা কৌশলে পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এলাকার বখাটে ছেলেদের সঙ্গেও মিশছে। দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। বয়সের তুলনায় পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েছে সে। এবার প্রাথমিকের পড়া শেষ করতে না পারলে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশু-কিশোরেরা প্রতিদিনই নানা মানসিক সমস্যা নিয়ে আসছে। তাদের বেশির ভাগের বয়স ১০ বছরের বেশি। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, খারাপ সঙ্গ, দামি জিনিসের বায়না এবং অবাধ্যতা। আগের তুলনায় শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক।
রাজধানীর একটি নামকরা স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীরও কাউন্সেলিং চলছে। তার মা জানিয়েছেন, ছেলে অল্পতেই রেগে যায়, কথা শোনে না, পরীক্ষায় খারাপ করছে এবং সন্ধ্যার পর বাইরে থাকে। এমনকি মাকে মারধরও করছে।
২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। এসব শিশুর ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পায়নি।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল বলেছেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক সমস্যার উদ্বেগজনক বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিনই নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে তারা চিকিৎসা নিতে আসছে। এসব পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে অনেক অভিভাবক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, নিজেরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তার মতে, অনেক সমস্যার শুরু মোবাইল ব্যবহার থেকে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষা, ভালো ফলের জন্য পরিবারের প্রত্যাশা, প্রতিযোগিতা এবং ব্যর্থতার ভয় কিশোরদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পারিবারিক অশান্তি, বুলিং, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও সহিংসতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তৈরি করছে নতুন চাপ।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বলেছেন, জিনগত বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক পরিবেশ ও সামাজিক পরিস্থিতি—এই তিনটি বিষয় শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে। জিনগত কারণ এড়ানো সম্ভব না হলেও সহায়ক পারিবারিক পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তার ভাষ্য, শিশুদের খেলাধুলার মাঠ কমে যাচ্ছে। নিরাপত্তার কারণে অনেককে বাসার বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। আবার চাকরি সামলে অভিভাবকেরা সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। ফলে শিশুরা একা হয়ে পড়ছে, সামাজিক যোগাযোগ কমছে। এতে আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখা ও সুস্থভাবে মানসিক বিকাশের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহারও সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে।
মনোরোগ চিকিৎসকেরা বলছেন, সন্তান খেলাধুলা বা বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দিলে, পড়াশোনায় মনোযোগ হারালে, অল্পতেই রেগে গেলে বা কান্নাকাটি করলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। দীর্ঘদিন ধরে ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাস বদলে যাওয়া কিংবা চুপচাপ হয়ে থাকাও মানসিক সমস্যার সংকেত হতে পারে।
মোহিত কামাল বলেছেন, সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন থাকতে হবে। কোনো সমস্যা মনে হলে তা লুকিয়ে না রেখে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শিশু-কিশোরদের মোবাইল ব্যবহার শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, তাদের ক্ষেত্রে মোবাইল নিষিদ্ধ রাখার পক্ষেও মত দিয়েছেন তিনি।























